উচ্চশিক্ষা আমাদের জীবনের খুব দরকারি একটা সময়। দেশে বা বিদেশে, ভালো মানের পড়াশোনার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন হয়। অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীর পক্ষেও এই খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময়ে, একটি এডুকেশন লোন বা স্টুডেন্ট লোন অনেক উপকারে আসে। বাংলাদেশের একটি পরিচিত ব্যাংক, ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেড (DBBL), ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা সহজ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের লোন দিয়ে থাকে।
একটা কথা হলো, “স্টুডেন্ট লোন” নামে একেবারে আলাদা কোনো লোন হয়তো ডাচ বাংলা ব্যাংকের সবসময় থাকে না। তারা প্রায়ই তাদের ‘পার্সোনাল লোন’ বা ব্যক্তিগত ঋণের মাধ্যমে পড়াশোনার খরচ মেটানোর সুবিধা দেয়। এই লোন আপনি পড়াশোনার যেকোনো কাজে, যেমন—ভর্তি ফি, টিউশন ফি, সেমিস্টার ফি, বা বিদেশে পড়াশোনার ক্ষেত্রে থাকা-খাওয়ার খরচের জন্য নিতে পারবেন।
আজকের এই পোস্টে আমরা ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে স্টুডেন্ট লোন (বা পড়াশোনার জন্য পার্সোনাল লোন) নেওয়ার সহজ নিয়মকানুন, কী কী যোগ্যতা লাগে এবং কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
Table of Contents
ডাচ বাংলা ব্যাংক স্টুডেন্ট লোন নাকি পার্সোনাল লোন?
শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। সরাসরি “স্টুডেন্ট লোন বাংলাদেশ” নামে ডাচ বাংলা ব্যাংকের কোনো আলাদা স্কিম সব সময় নাও থাকতে পারে। তারা এই সুবিধাটা তাদের ‘রিটেইল লোন’ বা সাধারণ ঋণের আওতায় দেয়। সাধারণত, এটা একটা ‘ডাচ বাংলা ব্যাংক পার্সোনাল লোন’ হিসেবে দেওয়া হয়, যার উদ্দেশ্য থাকে ‘শিক্ষার খরচ’ (Education Purpose) মেটানো।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই লোন শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, বরং তাদের বাবা-মা বা পরিবারের যিনি আয় করেন, তিনিও আবেদন করে নিতে পারেন। এই লোনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, শিক্ষার্থীর পড়াশোনার পথে যেন টাকা কোনো বাধা না হয়, তা ঠিক রাখা। দেশের ভেতরের ভালো কোনো ইউনিভার্সিটি হোক বা বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান, দুই জায়গার জন্যই এই লোনের আবেদন করা যায়।
ডাচ বাংলা ব্যাংক স্টুডেন্ট লোন পাওয়ার যোগ্যতা
স্টুডেন্ট লোনের ব্যাপারে প্রথম প্রশ্ন হলো—আবেদন করবে কে? বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীর তো নিজের কোনো আয় থাকে না। তাই ব্যাংক সাধারণত ছাত্রছাত্রীর পক্ষে তার অভিভাবককে (যেমন বাবা, মা) বা যিনি আইনগতভাবে অভিভাবক, তাকেই মূল আবেদনকারী হিসেবে চায়। ডাচ বাংলা ব্যাংক লোন পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে আবেদনকারীর কিছু সাধারণ শর্ত পূরণ করতে হয়।
প্রথমত, আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। তার একটি নির্দিষ্ট মাসিক আয় থাকতে হবে, যা দিয়ে ব্যাংক বুঝবে যে তিনি লোন শোধ করতে পারবেন। সাধারণত, আবেদনকারীর বয়স ২১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হয় (চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমার মধ্যে)।
লোন পেতে মাসিক আয় কেমন লাগে?
ব্যাংকের কাছে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, আবেদনকারী লোন শোধ করতে পারবেন কিনা। ডাচ বাংলা ব্যাংক সাধারণত তিন ধরনের পেশার মানুষকে এই লোন দেয়—যারা মাস গেলে বেতন পান (চাকরিজীবী), যারা ব্যবসা করেন (ব্যবসায়ী) এবং যারা নিজেরা কিছু করেন (যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা আর্কিটেক্ট)।
- চাকরিজীবীদের জন্য: একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে ১ থেকে ২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক বেতন থাকতে হয়। এই বেতনের পরিমাণ একেক সময় একেক রকম হতে পারে, তবে সাধারণত এটা ২০,০০০ টাকা বা তার বেশি হলে ব্যাংক সহজেই আবেদন গ্রহণ করে।
- ব্যবসায়ীদের জন্য: ব্যবসার বয়স কমপক্ষে ২ থেকে ৩ বছর এবং ব্যবসার মাসিক আয় বা বেচাকেনা ভালো হতে হয়।
লোন আবেদন করতে কী কী লাগে?
ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে পড়াশোনার জন্য লোন নিতে গেলে কিছু দরকারি কাগজপত্রের একটা লিস্ট তৈরি করতে হবে। এই কাগজপত্রগুলো আবেদনকারী, গ্যারান্টর (যিনি জামিনদার হবেন) এবং শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা আলাদা হয়। নিচে একটি সহজ লিস্ট দেওয়া হলো:
১. আবেদনকারী এবং গ্যারান্টরের জন্য (সবার যা লাগবে):
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID কার্ড) বা পাসপোর্টের পরিষ্কার ফটোকপি।
- সদ্য তোলা ২-৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ। এর জন্য রিসেন্ট কোনো বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস বিলের কাস্টমার কপি জমা দিলেই হবে।
২. আয়ের প্রমাণ (সবচেয়ে জরুরি অংশ):
- যদি আপনি চাকরিজীবী হন:
- অফিস থেকে দেওয়া স্যালারি সার্টিফিকেট বা চাকরির প্রমাণপত্র (যেখানে আপনার পদ, চাকরির সময় এবং বর্তমান বেতন লেখা থাকবে)।
- বিগত ৬ মাস বা ১ বছরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট (যে অ্যাকাউন্টে আপনার বেতন ঢোকে)।
- স্যালারি স্লিপ বা বেতনের রসিদ (যদি অফিস থেকে দেয়)।
- যদি আপনি ব্যবসায়ী বা স্ব-কর্মসংস্থানকারী হন:
- আপনার ব্যবসার আপডেট করা ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি।
- বিগত ১ বছরের ব্যবসায়িক ব্যাংক স্টেটমেন্ট।
- আয়কর বা টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেটের কপি।
- ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী অন্যান্য কাগজ (যেমন পার্টনারশিপ ব্যবসা হলে তার চুক্তিপত্র)।
৩. শিক্ষার্থীর পড়াশোনার কাগজপত্র:
- শিক্ষার্থী যে প্রতিষ্ঠানে (স্কুল, কলেজ বা ইউনিভার্সিটি) ভর্তি হতে চান, সেখান থেকে পাওয়া ‘অফার লেটার’ (Offer Letter) বা ‘অ্যাডমিশন লেটার’ (Admission Letter)।
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া মোট খরচের একটি বিস্তারিত হিসাব (এতে টিউশন ফি, ভর্তি ফি, থাকা-খাওয়ার খরচ ইত্যাদি লেখা থাকবে)।
- শিক্ষার্থীর আগের সব শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট ও মার্কশিটের ফটোকপি।
ডাচ বাংলা ব্যাংক স্টুডেন্ট লোন আবেদন করার বিস্তারিত পদ্ধতি
কাগজপত্র সব রেডি হয়ে গেলে লোন আবেদন করার কাজ শুরু করা যায়। ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার পদ্ধতি বেশ সহজ এবং কয়েকটি ধাপে হয়। নিচে ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:
ধাপ ১: ব্যাংকে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া
প্রথমে আপনার বাসার কাছের ডাচ বাংলা ব্যাংকের যেকোনো শাখায় চলে যান। ব্যাংকের লোন বিভাগে যে অফিসার আছেন, তার সাথে সরাসরি কথা বলুন। আপনার কেন লোন দরকার (দেশে বা বিদেশে পড়াশোনা), কত টাকা লাগবে এবং আপনার (বা অভিভাবকের) আয়ের উৎস কী, তা খোলাখুলি বলুন। ব্যাংক অফিসার আপনাকে বর্তমান সুদের রেট, প্রসেসিং ফি, মাসে কত টাকা কিস্তি (EMI) আসবে এবং মোট কত বছরের জন্য লোন পাবেন, সে সম্পর্কে একটা ধারণা দেবেন।
ধাপ ২: আবেদন ফর্ম নিয়ে পূরণ করা
ব্যাংক অফিসারের সাথে কথা বলে যদি আপনার সব ঠিক মনে হয়, তবে ব্যাংক থেকে লোনের আবেদন ফর্মটি নিন। এই ফর্মটি খুব সাবধানে পূরণ করতে হবে। আবেদনকারীর সব তথ্য, পেশার বিবরণ, আয়ের হিসাব, শিক্ষার্থীর তথ্য এবং গ্যারান্টরের তথ্য যেন কোনোভাবেই ভুল না হয়। ফর্মে ভুল থাকলে আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে।
ধাপ ৩: কাগজপত্র গুছিয়ে জমা দেওয়া
পূরণ করা ফর্মের সাথে ওপরে বলা সব দরকারি কাগজপত্র (যেমন আয়ের প্রমাণ, পড়াশোনার কাগজ, এনআইডি, ছবি) সুন্দর করে গুছিয়ে জমা দিন। ব্যাংকের লোন অফিসার আপনার ফাইলটি প্রথমে চেক করে দেখবেন সব ঠিক আছে কিনা। কোনো কাগজ কম থাকলে তিনি আপনাকে তা এনে জমা দিতে বলবেন।
ধাপ ৪: ব্যাংকের চেকিং ও ভেরিফিকেশন
আবেদন জমা দেওয়ার পর ব্যাংক আপনার দেওয়া সব তথ্য চেক করে দেখবে। এটা লোন প্রসেসের সবচেয়ে জরুরি ধাপ। ব্যাংকের লোক আপনার অফিসে বা ব্যবসার ঠিকানায় গিয়ে খোঁজ নিতে পারে। আপনার বাসার ঠিকানায় গিয়েও ভেরিফাই করতে পারে। এর পাশাপাশি, ব্যাংক আপনার সিআইবি (CIB) রিপোর্ট চেক করবে।
সিআইবি রিপোর্ট কী? (CIB Report)
সিআইবি রিপোর্ট হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে থাকা আপনার সব লোনের হিসাব। যদি আবেদনকারী বা গ্যারান্টরের নামে আগে কোনো লোন থাকে এবং তা শোধ করতে কোনো সমস্যা হয়ে থাকে (যাকে ‘খেলাপী’ বলে), তবে তা সিআইবি রিপোর্টে দেখা যায়। লোন পাশ (Approve) হওয়ার জন্য একটি পরিষ্কার সিআইবি রিপোর্ট থাকা খুব জরুরি। তাই, আগের কোনো লোন বা ক্রেডিট কার্ডের বিল বাকি থাকলে, আবেদন করার আগেই তা শোধ করে দেওয়া উচিত।
ধাপ ৫: লোন পাশ হওয়া এবং স্যাংশন লেটার
আপনার সব তথ্য যাচাই-বাছাই এবং সিআইবি রিপোর্ট ঠিক থাকলে, ব্যাংকের হেড অফিস বা দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা আপনার লোনটি পাশ (Approve) করবে। লোন পাশ হলে, ব্যাংক আপনাকে একটি ‘স্যাংশন লেটার’ বা অনুমোদনপত্র দেবে। এই চিঠিতে আপনার লোনের পরিমাণ, সুদের রেট, মেয়াদ এবং অন্য সব শর্ত পরিষ্কার করে লেখা থাকবে।
ধাপ ৬: সই করা এবং টাকা পাওয়া
স্যাংশন লেটার হাতে পাওয়ার পর আপনাকে ব্যাংকে গিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে সই করতে হবে। এই সময় ব্যাংক আপনার কাছ থেকে কিছু সিকিউরিটি হিসেবে কয়েকটি সই করা চেক (Undated Cheques) এবং গ্যারান্টরের সই নেবে। সব কাজ শেষ হলে, ব্যাংক আপনার লোনের টাকা ছাড়বে।
একটা জরুরি কথা হলো, পড়াশোনার লোনের ক্ষেত্রে ব্যাংক সাধারণত সব টাকা আবেদনকারীর হাতে ক্যাশ বা অ্যাকাউন্টে দেয় না। পড়াশোনার খরচ যেন ঠিক কাজেই ব্যবহার হয়, তাই ব্যাংক সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে ‘পে অর্ডার’ (Pay Order) বা ব্যাংক ড্রাফট করে টাকাটা পাঠিয়ে দেয়।
ডাচ বাংলা ব্যাংক লোন ইন্টারেস্ট রেট ও অন্যান্য বিষয়
ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে লোন নেওয়ার আগে আরও কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখুন।
প্রথমত, ডাচ বাংলা ব্যাংক লোন ইন্টারেস্ট রেট (Interest Rate) বা সুদের হার। এই হার সময়ের সাথে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী বদলাতে পারে। তাই আবেদন করার সময় লেটেস্ট রেট কত তা অবশ্যই পরিষ্কার করে জেনে নিন।
দ্বিতীয়ত, প্রসেসিং ফি (Processing Fee)। লোনটি প্রসেস করার জন্য ব্যাংক একটি সার্ভিস চার্জ নেয় (সাধারণত লোনের পরিমাণের ১% বা একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক)। এর বাইরে আর কোনো লুকানো খরচ (Hidden Charge) আছে কিনা, তা স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করে নেবেন।
তৃতীয়ত, লোনের মেয়াদ (Tenure) ঠিক করে দেয় আপনার মাসিক কিস্তি কত হবে। মেয়াদ বেশি নিলে, মাসে মাসে কিস্তি কম দিতে হয়, কিন্তু মোট সুদ একটু বেশি লাগে। আপনার আয়ের সাথে মিলিয়ে একটি সুবিধাজনক মেয়াদ বেছে নিন। সাধারণত এই লোনগুলো ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে শোধ করতে হয়।
শেষ কথা
সন্তানের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে টাকা-পয়সার সমস্যা একটা বড় বাধা হতে পারে। ডাচ বাংলা ব্যাংকের পার্সোনাল লোন (শিক্ষাখাতে) এই বাধা পার করার একটা ভালো উপায় হতে পারে। যদিও এটা সরাসরি ‘স্টুডেন্ট লোন’ নামে নাও থাকতে পারে, কিন্তু এর মাধ্যমে বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ সহজে চালিয়ে নিতে পারেন।
সঠিকভাবে লোন পাওয়ার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো—সঠিক ও সত্যি তথ্য দেওয়া, সব কাগজপত্র ঠিকঠাক প্রস্তুত রাখা এবং আবেদনকারীর (অভিভাবকের) ভালো আয় ও পরিষ্কার ক্রেডিট হিস্ট্রি থাকা। আপনি যদি সব শর্ত মানতে পারেন, তবে ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য লোন (Loan for students) পাওয়া বেশ সহজ। আপনার উচ্চশিক্ষার পথচলা সুন্দর হোক।





