বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ সারা দেশে গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে যে কয়টি সংস্থা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তার মধ্যে “গাক” (GUK – Gramer Unnoyon Karjokrom) একটি সুপরিচিত এবং আস্থার নাম। যখন কোনো সাধারণ মানুষ একটি ছোট উদ্যোগের জন্য ব্যাংকের দরজায় ঘোরেন, তখন প্রক্রিয়াগত জটিলতা এবং কাগজপত্রের ভিড়ে তার স্বপ্ন often থমকে যায়। ঠিক এখানেই “গাক” এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আশার আলো হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি কয়েক দশক ধরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ পরিবারকে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে রেখেছে অসামান্য ভূমিকা। আপনার যদি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি দৃঢ় সংকল্প থাকে এবং সেটির জন্য আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে গাক এনজিওর লোন পদ্ধতি আপনার জন্যই। এই গাইডে আমরা গাক থেকে লোন পাওয়ার প্রতিটি ধাপ বিস্তারিত তুলে ধরবো।
Table of Contents
গাক এনজিও লোনের প্রধান সুবিধাগুলো কী?
মানুষ ঠিক কী কারণে ব্যাংকের পরিবর্তে গাক এনজিওর লোন পছন্দ করে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে এর গ্রাহকবান্ধব সেবার মধ্যে। এখানে কোনো প্রথাগত ব্যাংকিং জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রিতা নেই। গাক-এর লোন সেবাগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন তা প্রান্তিক মানুষের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক হয়।
প্রথমত, এই লোন পেতে কোনো জমিজমা বা দামি কিছু জামানত হিসেবে বন্ধক রাখতে হয় না। দ্বিতীয়ত, আবেদন প্রক্রিয়া খুবই সহজ এবং খুব কম কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। তৃতীয়ত, লোন অনুমোদন এবং বিতরণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, গাক-এর মাঠকর্মীরা সরাসরি আপনার সমিতি বা কেন্দ্রে এসে সেবা প্রদান করেন এবং সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে ছোট ছোট কিস্তি সংগ্রহ করেন, যা পরিশোধ করা অনেক সহজ।
গাক এনজিও কী কী ধরনের লোন প্রদান করে?
গাক এনজিও বিশ্বাস করে যে, প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন আলাদা। তাই তারা বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন লোন স্কিম বা প্রকল্প চালু করেছে। আপনার প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আপনি সঠিক লোনটি বেছে নিতে পারবেন। নিচে গাক-এর প্রধান কয়েকটি লোন স্কিম আলোচনা করা হলো:
ক্ষুদ্রঋণ (প্রকল্প: জাগরণ)
গাক-এর কার্যক্রমের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এর “জাগরণ” নামক ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প। এটি মূলত গ্রামীণ ও শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে নারীদের, ছোট ছোট দল বা সমিতি গঠনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করে হাঁস-মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন, সেলাই কাজ, হস্তশিল্প, ছোট মুদি দোকান বা সবজি ব্যবসার মতো যেকোনো আয়বর্ধক কার্যক্রম শুরু করা যায়।
মাঝারি উদ্যোগ বা SME লোন (প্রকল্প: অগ্রসর)
যারা ইতোমধ্যে ক্ষুদ্রঋণের সাহায্যে নিজেদের ছোট ব্যবসাকে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন এবং এখন ব্যবসাকে আরও বড় করতে চান, তাদের জন্য গাক-এর রয়েছে “অগ্রসর” বা এসএমই (SME) লোন। এই লোনের পরিমাণ সাধারণ ক্ষুদ্রঋণের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হয় এবং এটি ব্যবসার পরিধি বাড়াতে, নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে বা দোকানে আরও বেশি মালামাল ওঠাতে সাহায্য করে।
কৃষি লোন (প্রকল্প: সুফলন)
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ, এই বাস্তবতা মাথায় রেখে গাক কৃষকদের জন্য “সুফলন” নামে বিশেষ কৃষি লোন চালু করেছে। এই লোন কৃষকদের মৌসুমী চাহিদা যেমন— সার, বীজ, কীটনাশক কেনা, সেচ পাম্প স্থাপন বা জমি চাষাবাদের মতো কাজে সরাসরি সহায়তা করে। অনেক ক্ষেত্রে ফসলের মৌসুমের সাথে মিল রেখে এই লোনের কিস্তি নির্ধারণের সুবিধাও থাকে।
বিশেষায়িত লোন (জীবনমান উন্নয়ন)
শুধু ব্যবসাই নয়, গাক তার সদস্যদের সার্বিক জীবনমান উন্নয়নেও মনোযোগী। এই লক্ষ্যে সংস্থাটি বিভিন্ন বিশেষায়িত লোন প্রদান করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বা স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য লোন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্য শিক্ষা লোন, এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি যেমন সোলার হোম সিস্টেম বা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য বিশেষ লোন।
গাক এনজিও লোন পাওয়ার যোগ্যতা
গাক-এর সেবার দরজা কার্যত সবার জন্য খোলা, তবে এই আর্থিক সেবা গ্রহণের জন্য কিছু প্রাথমিক শর্ত পূরণ করতে হয়, যা মোটেও জটিল নয়।
- আবেদনকারীকে অবশ্যই গাক এনজিওর নির্ধারিত কর্ম এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হয়।
- গাক-এর ক্ষুদ্রঋণ মডেলের প্রধান শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীকে একটি দল বা সমিতির সদস্য হতে হবে।
- আবেদনকারীর অবশ্যই আয়ের একটি চলমান উৎস থাকতে হবে অথবা লোন নিয়ে আয়বর্ধক কাজ করার সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে।
- আবেদনকারী অন্য কোনো ব্যাংক বা এনজিওর কাছে ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত হওয়া যাবে না।
লোন আবেদনের জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন?
এনজিও লোনের সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো এর জন্য নগণ্য কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। গাক এনজিওতে লোনের জন্য আবেদন করতে সাধারণত নিচের ডকুমেন্টগুলো জমা দিলেই চলে:
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কার্ডের একটি পরিষ্কার ফটোকপি।
- আবেদনকারীর সদ্য তোলা ২ বা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- একজন গ্যারান্টর বা জামিনদারের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কার্ডের ফটোকপি ও ছবি (যিনি সাধারণত সমিতির অন্য সদস্য বা পরিবারের কেউ হতে পারেন)।
- মাঝারি বা বড় অংকের SME লোনের ক্ষেত্রে, ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স বা উদ্যোগ সম্পর্কিত অন্যান্য কাগজের প্রয়োজন হতে পারে (যদি থাকে)।
গাক এনজিও লোন আবেদন পদ্ধতি
গাক-এর লোন পাওয়ার সম্পূর্ণ পদ্ধতিটি কয়েকটি সহজ ধাপে বিভক্ত। প্রক্রিয়াটি খুবই স্বচ্ছ এবং গ্রাহকবান্ধব।
ধাপ ১: প্রাথমিক যোগাযোগ ও সমিতি গঠন
লোন নেওয়ার প্রথম ধাপ হলো আপনার এলাকায় গাক-এর শাখা অফিস কোথায় তা খুঁজে বের করা, অথবা পরিচিত কোনো সদস্য বা মাঠকর্মীর সাথে কথা বলা। গাক-এর ক্ষুদ্রঋণ যেহেতু সমিতি ভিত্তিক, তাই আপনাকে বিদ্যমান কোনো দলে যোগ দিতে হবে অথবা আপনার প্রতিবেশীদের নিয়ে ৫-৭ জনের একটি নতুন দল বা সমিতি গঠন করতে হবে।
ধাপ ২: আবেদন ফরম পূরণ ও সঞ্চয় শুরু
দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর, আপনাকে একটি আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। একই সাথে, গাক-এর নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে একটি ব্যক্তিগত সঞ্চয় অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং সেখানে সাপ্তাহিক বৈঠকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ (খুব অল্প হলেও) টাকা জমা রাখা শুরু করতে হবে। এই সঞ্চয় আপনার মধ্যে জমানোর অভ্যাস তৈরি করে এবং আপনার ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ধাপ ৩: ফিল্ড ভিজিট ও আবেদন যাচাই-বাছাই
আপনি আবেদন ফরম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর, গাক-এর একজন ফিল্ড অফিসার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আপনার আবেদনটি যাচাই করবেন। তিনি আপনার বাড়ি পরিদর্শন করতে পারেন, আপনার দেওয়া তথ্য এবং লোনের উদ্দেশ্য (কী কাজে টাকা খরচ করবেন) সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেবেন।
ধাপ ৪: লোন অনুমোদন ও বিতরণ
আপনার আবেদন, পরিকল্পনা এবং যাচাই-বাছাই রিপোর্ট সন্তোষজনক হলে, সমিতি ও শাখা ব্যবস্থাপকের অনুমোদন সাপেক্ষে আপনার লোনটি পাশ করা হয়। লোন অনুমোদিত হলে, সাধারণত সমিতির সাপ্তাহিক বৈঠকেই সকল সদস্যের সামনে আপনাকে লোনের টাকা (নগদ বা চেকের মাধ্যমে) প্রদান করা হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
গাক এনজিওর লোন নিয়ে অনেকের মনেই কিছু সাধারণ প্রশ্ন থাকে। চলুন সেগুলোর উত্তর জেনে নেওয়া যাক।
গাক এনজিওর সার্ভিস চার্জ বা সুদের হার কত?
এনজিওগুলো সাধারণত ‘সুদ’ না বলে ‘সার্ভিস চার্জ’ বা ‘পরিষেবা মাশুল’ গ্রহণ করে। গাক এনজিও বাংলাদেশ সরকারের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA) কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা সম্পূর্ণ অনুসরণ করে। সাধারণত, ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে এই সার্ভিস চার্জের হার MRA-এর বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ সীমার (যেমন, বার্ষিক ২৪% বা ২৫%, যা ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়) মধ্যেই থাকে।
প্রথমবার কত টাকা লোন পাওয়া যায়?
আপনি যদি গাক থেকে প্রথমবার লোন নেন, তবে লোনের পরিমাণ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত থাকে (যেমন, ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা, যা প্রকল্প ভেদে ভিন্ন হয়)। আপনি যদি সময়মতো সব কিস্তি পরিশোধ করেন এবং আপনার সঞ্চয় নিয়মিত রাখেন, তবে আপনার বিশ্বস্ততা বাড়বে এবং পরবর্তী সময়ে আপনি আরও বেশি পরিমাণ লোনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।
কোনো কারণে কিস্তি দিতে না পারলে কী হবে?
অসুস্থতা, ব্যবসায়িক লোকসান বা পারিবারিক কোনো বাস্তব সমস্যার কারণে কিস্তি দিতে অসুবিধা হতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভয় না পেয়ে বা লুকিয়ে না থেকে, বিষয়টি সরাসরি আপনার সমিতির বৈঠকে বা দায়িত্বরত মাঠকর্মীকে জানাতে হবে। আপনার সমস্যাটি যৌক্তিক হলে গাক-এর কর্মীরা আপনাকে কিস্তি পরিশোধের জন্য সময় বাড়িয়ে দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করবেন।
সমিতি ছাড়া কি গাক থেকে লোন নেওয়া যায়?
গাক-এর মূল ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ দল বা সমিতি ভিত্তিক। কারণ এই মডেলে দলের সদস্যরাই একে অপরের জামিনদার হিসেবে কাজ করেন। তবে, “অগ্রসর” (SME) বা কৃষি লোনের মতো কিছু বড় অংকের লোনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। এর জন্য আপনাকে সরাসরি শাখা অফিসে যোগাযোগ করে তাদের নির্দিষ্ট স্কিম সম্পর্কে জানতে হবে।
লোন নিতে কি কোনো জামানত লাগে?
সাধারণত ক্ষুদ্রঋণ বা ছোট অংকের লোনের জন্য কোনো জমিজমা বা দামি কিছু বন্ধক বা জামানত হিসেবে রাখতে হয় না। এক্ষেত্রে আপনার সমিতির অন্য সদস্যরাই আপনার পারস্পরিক জামিনদার হিসেবে কাজ করেন। তবে, খুব বড় অংকের SME লোনের ক্ষেত্রে গাক-এর পলিসি অনুযায়ী আংশিক জামানতের প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
“গাক” বা গ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রম শুধু একটি লোন প্রদানকারী সংস্থাই নয়, এটি লক্ষ লক্ষ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পথপ্রদর্শক। এর সহজ, দ্রুত এবং জামানতবিহীন লোন প্রক্রিয়া বহু মানুষকে উদ্যোক্তা হতে এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সাহায্য করছে।
আপনার যদি একটি ভালো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকে এবং আপনি পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে চান, তবে গাক এনজিওর লোন আপনার জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। লোন নেওয়ার আগে অবশ্যই আপনার প্রয়োজন, পরিশোধের ক্ষমতা এবং এনজিওর সকল নিয়ম-কানুন ভালোভাবে বুঝে নিন।





