বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর (এনজিও) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এবং শহরের সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এনজিওগুলো ব্যাংকগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে “আশা” (ASA – Association for Social Advancement) কেবল বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের একটি অন্যতম বৃহৎ এবং সফল মডেল হিসেবে পরিচিত।
আশা তার সহজ, দক্ষ এবং গ্রাহকবান্ধব ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে, বিশেষ করে নারীদের, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে। আপনার যদি একটি ছোট ব্যবসা শুরু করার, কৃষিকাজে বিনিয়োগ করার বা নিজের উদ্যোগে আয় বাড়ানোর জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়, তবে আশা এনজিও লোন হতে পারে আপনার জন্য একটি আদর্শ সমাধান। এই পোস্টে, আমরা আশা এনজিও থেকে লোন পাওয়ার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, যোগ্যতা এবং সুবিধাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
Table of Contents
আশা এনজিও লোনের প্রধান সুবিধাগুলো কী?
আশা এনজিওর লোন ব্যবস্থাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন তা সাধারণ মানুষের জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য হয়। ব্যাংক লোনের আনুষ্ঠানিকতা এবং জটিলতার তুলনায় এর সুবিধাগুলো অনেক বেশি।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো লোনের দ্রুত অনুমোদন এবং বিতরণ প্রক্রিয়া। আবেদন করার জন্য খুব বেশি কাগজপত্রের প্রয়োজন হয় না, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক। ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে সাধারণত বড় কোনো জামানত বা জমিজমা বন্ধক রাখার প্রয়োজন হয় না। লোন পরিশোধের জন্য সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির ব্যবস্থা থাকে, যা ঋণগ্রহীতারা তাদের আয় থেকে সহজেই পরিশোধ করতে পারেন। এছাড়া আশার মাঠকর্মীরা সরাসরি গ্রাহকদের নির্ধারিত কেন্দ্র বা সমিতির বৈঠকে সেবা প্রদান করেন, ফলে ব্যাংকে গিয়ে সময় নষ্ট করার প্রয়োজন হয় না।
আশা এনজিও কী কী ধরনের লোন প্রদান করে?
আশা তার সদস্যদের বিভিন্ন ধরনের আর্থিক চাহিদা এবং উদ্যোগের স্তর বিবেচনা করে একাধিক লোন স্কিম বা প্রকল্প পরিচালনা করে। আপনার প্রয়োজন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী আপনি সঠিক লোনটি বেছে নিতে পারবেন। নিচে আশার কয়েকটি জনপ্রিয় লোন সেবা নিয়ে আলোচনা করা হলো:
ক্ষুদ্রঋণ (Microcredit)
এটিই আশা এনজিওর প্রধান এবং সবচেয়ে পরিচিত লোন সেবা। এই প্রকল্পটি মূলত গ্রামীণ এবং শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে নারীদের, ছোট ছোট দল বা সমিতি গঠনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যবহার করে সেলাই কাজ, হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগল পালন, হস্তশিল্প, ছোট মুদি দোকান, সবজি ব্যবসা বা এই ধরনের যেকোনো আয়বর্ধক কার্যক্রম শুরু করা যায়।
মাঝারি উদ্যোগ বা SME লোন
যারা ইতোমধ্যে ক্ষুদ্রঋণের সাহায্যে নিজেদের ছোট ব্যবসাকে একটি পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন এবং এখন ব্যবসাকে আরও বড় করতে চান, তাদের জন্য আশা মাঝারি উদ্যোগ বা এসএমই (SME) লোন প্রদান করে। এই লোনের পরিমাণ সাধারণ ক্ষুদ্রঋণের চেয়ে বেশি হয় এবং এটি ব্যবসার পরিধি বাড়াতে, নতুন যন্ত্রপাতি কিনতে বা দোকানে আরও বেশি মালামাল ওঠাতে সাহায্য করে।
কৃষি লোন
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। আশা কৃষকদের মৌসুমী চাহিদা মেটাতে এবং কৃষির আধুনিকীকরণে সহায়তা করতে বিশেষ কৃষি লোন প্রদান করে। এই লোন সাধারণত সার, বীজ, কীটনাশক কেনা, সেচ পাম্প স্থাপন বা জমি চাষাবাদের মতো কাজে ব্যবহার করা হয়।
বিশেষায়িত লোন
সদস্যদের জীবনযাত্রার মান সার্বিকভাবে উন্নয়নের লক্ষ্যে আশা কিছু বিশেষায়িত লোনও প্রদান করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বা স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য লোন, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটানোর জন্য শিক্ষা লোন, এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি যেমন সোলার হোম সিস্টেম বা বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য বিশেষ লোন।
আশা এনজিও লোন পাওয়ার যোগ্যতা
আশা থেকে লোন পাওয়ার যোগ্যতাগুলো অত্যন্ত সাধারণ রাখা হয়েছে, যেন সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোও এই আর্থিক সেবার আওতায় আসতে পারে।
- আবেদনকারীকে অবশ্যই আশা এনজিওর নির্ধারিত কর্ম এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে।
- বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হয়।
- এনজিওর মূল নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীকে একটি দল বা সমিতির সদস্য হতে হবে।
- আবেদনকারীর অবশ্যই আয়ের একটি চলমান উৎস থাকতে হবে অথবা লোন নিয়ে আয়বর্ধক কাজ করার সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকতে হবে।
- আবেদনকারী অন্য কোনো ব্যাংক বা এনজিওর কাছে ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত হওয়া যাবে না।
লোন আবেদনের জন্য কী কী কাগজপত্র প্রয়োজন?
এনজিও লোনের একটি বড় সুবিধা হলো এর জন্য নগণ্য কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়। আশা এনজিওতে লোনের জন্য আবেদন করতে সাধারণত নিচের ডকুমেন্টগুলো জমা দিতে হয়:
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কার্ডের একটি পরিষ্কার ফটোকপি।
- আবেদনকারীর সদ্য তোলা ২ বা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- একজন গ্যারান্টর বা জামিনদারের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) কার্ডের ফটোকপি ও ছবি (যিনি সাধারণত সমিতির অন্য সদস্য বা পরিবারের কেউ হতে পারেন)।
- মাঝারি বা বড় অংকের SME লোনের ক্ষেত্রে, ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স বা উদ্যোগ সম্পর্কিত অন্যান্য কাগজের প্রয়োজন হতে পারে (যদি থাকে)।
আশা এনজিও লোন আবেদন প্রক্রিয়া
আশা এনজিওর লোন পাওয়ার প্রক্রিয়া খুবই স্বচ্ছ, দ্রুত এবং ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে এর সাধারণ ধাপগুলো তুলে ধরা হলো:
ধাপ ১: শাখা অফিস বা সমিতির বৈঠকে যোগাযোগ
প্রথমে আপনার এলাকায় আশার শাখা অফিস কোথায় তা খুঁজে বের করতে হবে অথবা আপনার পরিচিত কারো মাধ্যমে আশার কোনো সমিতির বৈঠকে যোগ দিতে হবে। সেখানে দায়িত্বরত মাঠকর্মী বা লোন অফিসারের সাথে কথা বললে তিনি আপনাকে তাদের লোন কার্যক্রম, সার্ভিস চার্জ এবং নিয়মাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দেবেন।
ধাপ ২: দল বা সমিতিতে যোগদান
আশার ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মূলত দল বা সমিতি ভিত্তিক। লোন পেতে হলে, আপনাকে প্রথমে ৫ থেকে ১০ জনের একটি দলে যোগ দিতে হবে অথবা প্রতিবেশীদের নিয়ে নতুন দল গঠন করতে হবে। এই দলের সদস্যরা একে অপরের ঋণের জন্য পারস্পরিক জামিনদার হিসেবে কাজ করেন, যা জামানতবিহীন লোনের ভিত্তি তৈরি করে।
ধাপ ৩: আবেদন ফরম পূরণ ও সাপ্তাহিক সঞ্চয়
দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর, আপনাকে একটি আবেদন ফরম পূরণ করতে হবে। একই সাথে, আশার নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে একটি ব্যক্তিগত সঞ্চয় অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং সেখানে সাপ্তাহিক বৈঠকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অল্প অল্প করে টাকা জমা রাখা শুরু করতে হবে। এই সঞ্চয় আপনার ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবেও কাজ করে।
ধাপ ৪: কাগজপত্র জমা ও যাচাই-বাছাই
পূরণ করা আবেদন ফরম এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (NID কার্ড, ছবি) মাঠকর্মীর কাছে জমা দিতে হবে। এরপর এনজিওর কর্মী আপনার বাড়ি পরিদর্শন করতে পারেন এবং আপনার দেওয়া তথ্য, আয়ের পরিকল্পনা এবং লোন ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করে দেখবেন।
ধাপ ৫: লোন অনুমোদন ও বিতরণ
আপনার আবেদন এবং যাচাই-বাছাই রিপোর্ট সন্তোষজনক হলে, সমিতি ও শাখা ব্যবস্থাপকের অনুমোদন সাপেক্ষে আপনার লোনটি পাশ করা হয়। লোন অনুমোদিত হলে, সাধারণত সমিতির সাপ্তাহিক বৈঠকেই সকল সদস্যের সামনে আপনাকে লোনের টাকা (নগদ বা চেকের মাধ্যমে) প্রদান করা হয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
আশা এনজিওর লোন নিয়ে অনেকের মনেই কিছু সাধারণ প্রশ্ন তৈরি হয়। চলুন সেগুলোর উত্তর জেনে নেওয়া যাক।
আশা এনজিওর সার্ভিস চার্জ বা সুদের হার কত?
এনজিওগুলো সাধারণত ‘সুদ’ না বলে ‘সার্ভিস চার্জ’ বা ‘পরিষেবা মাশুল’ গ্রহণ করে। আশা এনজিও বাংলাদেশ সরকারের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA) কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা সম্পূর্ণ অনুসরণ করে। সাধারণত, ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে এই সার্ভিস চার্জের হার MRA-এর বেঁধে দেওয়া সর্বোচ্চ সীমার (যেমন, বার্ষিক ২৪% বা ২৫%, যা ক্রমহ্রাসমান পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়) মধ্যেই থাকে।
প্রথমবার কত টাকা লোন পাওয়া যায়?
আপনি যদি আশা থেকে প্রথমবার লোন নেন, তবে লোনের পরিমাণ সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত থাকে (যেমন, ১০,০০০ থেকে ৩০,০০০ টাকা, যা প্রকল্প ভেদে ভিন্ন হয়)। আপনি যদি সময়মতো সব কিস্তি পরিশোধ করেন এবং আপনার সঞ্চয় নিয়মিত রাখেন, তবে আপনার বিশ্বস্ততা বাড়বে এবং পরবর্তী সময়ে আপনি আরও বেশি পরিমাণ লোনের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।
কিস্তি দিতে দেরি হলে কী করণীয়?
অসুস্থতা, ব্যবসায়িক লোকসান বা পারিবারিক কোনো বাস্তব সমস্যার কারণে কিস্তি দিতে অসুবিধা হলে, তা সমিতির বৈঠকে বা সরাসরি মাঠকর্মীকে জানাতে হবে। আপনার সমস্যাটি যৌক্তিক হলে আশার কর্মীরা আপনাকে কিস্তি পরিশোধের জন্য সময় বাড়িয়ে দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করবেন।
সমিতি ছাড়া কি আশা থেকে লোন নেওয়া যায়?
আশার বেশিরভাগ ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পই দল বা সমিতি ভিত্তিক, কারণ এটিই তাদের সফল মডেলের ভিত্তি। তবে, মাঝারি বা SME লোনের মতো কিছু বড় অংকের লোনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করার সুযোগ থাকতে পারে। এর জন্য আপনাকে সরাসরি শাখা অফিসে যোগাযোগ করে তাদের নির্দিষ্ট স্কিম সম্পর্কে জানতে হবে।
লোন নিতে কি কোনো জামানত লাগে?
সাধারণত ক্ষুদ্রঋণ বা ছোট অংকের লোনের জন্য কোনো জমিজমা বা দামি কিছু বন্ধক বা জামানত হিসেবে রাখতে হয় না। এক্ষেত্রে আপনার সমিতির অন্য সদস্যরাই আপনার পারস্পরিক জামিনদার হিসেবে কাজ করেন। তবে, খুব বড় অংকের SME লোনের ক্ষেত্রে আশার পলিসি অনুযায়ী আংশিক জামানতের প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
আশা এনজিও দেশের লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ছোঁয়া দিয়েছে। এর সহজ, দ্রুত এবং জামানতবিহীন লোন প্রক্রিয়া বহু মানুষকে উদ্যোক্তা হতে এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে সাহায্য করছে।
আপনার যদি একটি ভালো ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকে এবং আপনি পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে চান, তবে আশা এনজিওর লোন আপনার জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। লোন নেওয়ার আগে অবশ্যই আপনার প্রয়োজন, পরিশোধের ক্ষমতা এবং এনজিওর সকল নিয়ম-কানুন ভালোভাবে বুঝে নিন।





